দেওয়ানগঞ্জের 'শ্যামল দাদাই' যেন আসমানের চাঁদ: আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এক বিতর্কিত অধ্যায়
জাকিরুল ইসলাম বাবু জামালপুর
পতিত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী ব্যবসায়ী, মেসার্স দুর্গা এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল চন্দ্র সাহাকে ঘিরে এখন সর্বত্রই আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। নারী কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম—সবখানেই জড়িয়ে আছে এই 'শ্যামল দাদা'র নাম। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতার পালাবদলেও তার এই দাপটের নেপথ্য উৎস কোথায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভাগ্য বদলে যায় শ্যামল সাহার। জামালপুরের তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা মির্জা আজম ও আবুল কালাম আজাদের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সফরসঙ্গী হয়ে নিউইয়র্কে গিয়ে প্রভাবশালী এমপিদের সাথে ফটোসেশন করে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যান তিনি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এমপি-মন্ত্রীদের দামি উপহার ও উপঢৌকন দিয়ে বশ করে রাখা শ্যামল সাহা একসময় এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, তার উপস্থিতিতে ত্যাগী নেতাকর্মীদেরও মন্ত্রীদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে হতো।
এলজিইডি, সওজ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একচেটিয়া ঠিকাদারি বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। টাঙ্গাইলে তার নির্মিত পিসি গার্ডার ব্রিজ ভেঙে পড়লেও রহস্যজনক কারণে তাকে কোনো আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় দশকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। এমনকি জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণহত্যাকালে আওয়ামী লীগকে বিশাল অংকের অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর পতিত ফ্যাসিবাদের এই দোসর ভোল পাল্টানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির কিছু স্থানীয় নেতাকে ম্যানেজ করে তিনি তার ব্যবসার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে চাইছেন। সম্প্রতি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ময়মনসিংহে এলজিইডির ২২ কোটি টাকার একটি কাজ সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে 'নোয়া' (NOA) পেলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তিনামায় সই না করায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—একজন চিহ্নিত ফ্যাসিবাদী দোসর কীভাবে এখনো প্রশাসনের চোখের সামনে দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন।
ব্যবসায়িক দুর্নীতির পাশাপাশি শ্যামল সাহার চারিত্রিক স্খলন ও অবৈধ কারবার নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ২০১০ সালে ভাসমান পতিতা সহ পুলিশের হাতে আটক হওয়া থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে তার প্রতিষ্ঠানের ট্রাকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ পাচারের অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা হালিম দুলাল জানান, "এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে চোরাই মদের সিন্ডিকেট চালিয়েছেন। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রশাসনের ওপর জনআস্থা ক্ষুণ্ণ হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শ্যামল চন্দ্র সাহার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। দেওয়ানগঞ্জের মানুষ এখন অধীর অপেক্ষায়—কবে আইনের আওতায় আসবেন এই বিতর্কিত 'ক্ষমতার বরপুত্র'।
এই প্রতিবেদনটি কেমন লাগলো?
মন্তব্য ()
সাইন-ইনদ্রষ্টব্য: প্রতিটি মন্তব্য পর্যালোচনা করা হয়। অপ্রাসঙ্গিক ও আপত্তিকর মন্তব্য প্রকাশিত হয় না।