ইরানের 'আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি' ও আমেরিকার ডলার-সংকট: যুদ্ধের ৩ সপ্তাহে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র বদল
প্রতিবেদক আরব আমিরাত
ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান যুদ্ধ আজ তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি দুটি দেশের লড়াই মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আগামীর বিশ্ব নেতৃত্ব দখলের এক মহাযুদ্ধ। যুদ্ধক্ষেত্রে বোমার আওয়াজ ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠছে কৌশলগত জয়-পরাজয়ের হিসাব। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই যুদ্ধে সামরিক শক্তির চেয়েও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চালগুলো বেশি কার্যকর হচ্ছে।
বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকরা অবাক হয়ে দেখছেন ইরানের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি’ বা ভূগর্ভস্থ সামরিক শহরগুলোর কার্যকারিতা। মাটির ওপরে ইরান অনেকটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, মাটির নিচে তাদের কয়েক স্তরের সুরক্ষিত টানেল নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত। এই ঘাঁটিগুলো থেকে ইরান ক্রমাগত ড্রোন ও মিসাইল উৎক্ষেপণ করে চলেছে, যা আমেরিকার অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এই যুদ্ধে আমেরিকা ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়ের মুখোমুখি। ন্যাটোর শক্তিশালী দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে এক প্রকার ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনকে প্রায় একা এই ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহে আমেরিকার ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২.৮ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতিতে ধস নামার উপক্রম হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন। ইরান থেকে সস্তায় তেল কেনার পাশাপাশি তারা বেইজিংয়ের মুদ্রা ‘ইউয়ান’-কে বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী করছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, চীন তাদের এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে আমেরিকার ‘অদৃশ্য’ বি-টু (B-2) বোম্বারকে ট্র্যাক করতে সক্ষম হয়েছে। এটি আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ওপর এক বিরাট আঘাত। এই সুযোগে চীন তাইওয়ান দখলের পথ আরও সুগম করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চাপে থাকা রাশিয়া এখন অনেকটা স্বস্তিতে। আমেরিকার পূর্ণ মনোযোগ ইরানের দিকে ঘুরে যাওয়ায় পুতিন বাহিনী ইউক্রেনে তাদের আক্রমণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ইরানকে স্যাটেলাইট তথ্য ও ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে রাশিয়া যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
ইউরোপ এই যুদ্ধে সরাসরি না জড়ালেও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে তাদের অর্থনীতি পঙ্গু হওয়ার পথে। রাশিয়ার পর এখন ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধাবস্থার কারণে ইউরোপের দেশগুলো বিকল্প হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে, যা পশ্চিমের দীর্ঘদিনের ঐক্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
গাণিতিক হিসাবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে চীন। ইরান ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েও প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে টিকে আছে। অন্যদিকে, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং মিত্রহীন হয়ে পড়ার কারণে ক্ষমতা ও সম্মানের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি পরাজিত নাম হিসেবে উঠে আসছে আমেরিকা। আগামী দুই মাস এই যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করবে—পৃথিবী কি একমেরু থাকবে নাকি নতুন কোনো বিশ্বশক্তির উত্থান ঘটবে।
এই প্রতিবেদনটি কেমন লাগলো?
মন্তব্য ()
সাইন-ইনদ্রষ্টব্য: প্রতিটি মন্তব্য পর্যালোচনা করা হয়। অপ্রাসঙ্গিক ও আপত্তিকর মন্তব্য প্রকাশিত হয় না।